ওয়াহিদ নীল. ওয়াহিদ নীল — নামটা যেমন সহজ, তেমনি তার… | by Owahid Neel | Aug, 2025

1b4AlVN 1VjnRZNuR1A7k4w.jpeg

ওয়াহিদ নীল — নামটা যেমন সহজ, তেমনি তার জীবনও কিন্তু সাধারণ নয়। জন্ম ১৯৯৫ সালের ২১ জুলাই, বাংলাদেশের ছোট্ট গ্রাম পূর্ব চররো সুন্দী, শরীয়তপুরে। গ্রামের মাটি, মানুষের সাদামাটা জীবন আর স্বপ্নের বিশাল আকাশের নিচে বেড়ে ওঠা এই ছেলেটার মনে ছিল একটাই জিনিস — নিজের পায়ের ছাপ রেখে যাওয়া, নতুন জগত দেখার আগ্রহ আর জীবনের অসীম সম্ভাবনায় বিশ্বাস।

শৈশব থেকেই নীলু ছিল এক ধরনের স্বপ্নবাজ, যিনি কেবল পড়াশোনা নয়, জীবনকেও উপলব্ধির চোখে দেখত। স্কুল-কলেজ জীবন কাটিয়ে Northern University of Bangladesh থেকে বিজনেসে গ্রাজুয়েশন করলেও, হৃদয় ও মনের এক কোণে তার বাসা বেঁধেছিল ভ্রমণ আর গল্প বলার শিল্পে।

তবে জীবনের পথে সবসময় সোজা রাস্তা থাকে না। হতাশা, অর্থনৈতিক বাধা, সময়ের সংকট — এসব এসেছিল, কিন্তু নীল কখনো হার মানেনি। বরং এসব বাধাকে নিজের জীবনের বড় শিক্ষায় পরিণত করেছে। ২০২২ সালে তার জীবনের প্রথম বড় সিঁড়ি হিসেবে দুবাই ভ্রমণের সুযোগ আসে। সেটাই ছিল তার জন্য এক নতুন দিগন্তের শুরু।

ভ্রমণ মানেই শুধু নতুন শহরের ছবি তোলা নয়, ভেতরের মানুষের গল্প, সংস্কৃতির স্পন্দন, এবং কখনো কখনো নিজের আত্মাকে খুঁজে পাওয়া। নীলের ইউটিউব চ্যানেল “Owahid Neel” এই যাত্রার সাক্ষী। প্রতিটি ভিডিওতে সে শুধু নতুন জায়গার ছবি তুলে ধরে না, বরং মানুষের অনুভূতি, ইতিহাস, সংস্কৃতি আর ভিসা ও ভ্রমণ সংক্রান্ত দরকারি তথ্য দিয়ে দর্শকদের কাছে পৌঁছে দেয়। অনেক সময় সে বলে, “ভ্রমণ আমাকে শিখিয়েছে কীভাবে অজানা জায়গায় নিজের জায়গা গড়ে তুলতে হয়, আর কতটা সহজ জীবনকে নতুন করে দেখতে পারা।”

কিন্তু আমার কথা বলতে গেলে, আমার জীবনের সবচেয়ে বড় গল্পটা হলো আমার বাবা। যেই মানুষটাকে ছবিতে দেখছো, তিনিই আমার “সুপার হিরো”। ২০০৩ সালে যখন আমি ক্লাস থ্রিতে পড়তাম, তখন তিনি বাংলাদেশ ছেড়ে প্রথম সৌদি আরব যান। সেই থেকেই শুরু হয়েছে তার প্রবাস জীবন। হাজার কষ্ট, দূরত্ব, অবিচ্ছিন্ন পরিশ্রম আর বঞ্চনার মাঝ দিয়েই আজ ২০২২ সাল — তার প্রবাসী নামের খাতা থেকে নাম কাটা যায়নি এখনও। সে আজও একজন প্রবাসী, আমাদের পরিবারের জন্য নিজের সুখ-সুবিধা ত্যাগ করে।

২০০৩ সালে আমি প্রথম বাবাকে চিঠি লিখেছিলাম। পরে ২০০৩ সালের শেষের দিকে তিনি আমার হাতে মোবাইল ফোন দিয়েছিলেন — সেই সময়ে গ্রামে সর্বোচ্চ ১০টা মোবাইলের মধ্যে একটায় আমারও নাম। ২০০৮ সালে আমাকে Nokia-N73 মোবাইলটা কিনে দিয়েছিলেন। এখান থেকেই আমার ইন্টারনেট জগতে প্রবেশ, নতুন নতুন ওয়েবসাইট, অ্যাপ, ফিচার সম্পর্কে জানার আগ্রহ জন্ম নিলো।

২০১৩ সালে ল্যাপটপ, ২০১৪ সালে আইফোন কিনে দিয়েছিলেন, Northern University থেকে আমার পড়াশোনার ব্যয়ও দিয়েছিলেন — all এই ত্যাগ বাবার প্রবাস জীবন থেকে। ২০০৩ থেকে ২০১২ পর্যন্ত ৯ বছর টানা প্রবাসে ছিলেন, দেশে আসার সুযোগ হয়নি একটুও, আমাদের কাউকে একটা পলক দেখাতে পারেননি। আমার ছোট বোনকে কোলে নিতে পারেননি। আমার হাত ধরে বাজারে যেতে পারিনি — সব কষ্ট একাই গিলে নিয়েছেন।

কিন্তু তিনি কখনো আফসোস করেননি। আমি যখন যা চাই, যেভাবে চাই, সব দিয়েছেন। আজও তার মুখে “না” শুনিনি — কেননা বাবা “না” বলতে জানেন না। যতই কষ্ট হোক, আমাদের দিয়েছেন, আমাদের বোনদের দিয়েছেন, আমাদের ছেলেমেয়েদের দিয়েছেন। অথচ নিজেকে ছেড়া গেঞ্জি পরেছেন। বাবারা সত্যিই অদ্ভুত মানুষ — ঘরে যত টাকা কাপড় থাকুক, নিজের জন্য সবসময় সবচেয়ে সস্তা, সবচেয়ে কম দামের জিনিস বেছে নেন।

২০১৮ সালে আমাকে ৩ লাখ টাকা খরচ করে বাইক কিনে দিয়েছেন। আমি কখনো বাবাকে কিছু দিতে পারিনি। চাকরি পাওয়া বছরেও তার কাছে মাত্র ৫০০ টাকা দিয়েছিলাম, যা তিনি ১০০ টাকা চাইছিলেন! তখন মনে হয়েছিল, সমস্ত টাকা দিয়ে বাবার পায়ের কাছে ছুঁড়ে দিতে চাই। কিন্তু বলিনি — বাবা বলেছিলেন, “তোর লাগবে না? তুই আমাকে দিলে বাকি মাস কিভাবে চলবি?” আমি হেসে বলেছিলাম, “আমার লাগলে তো আপনি আছেনই।”

এই মানুষটাই আমার পাশে আছেন আজও। ২০২২ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি আমি দুবাই এলাম, কাজ পাইনি এখনও, চারটা দেশ ঘুরে দেখেছি, খরচটাও বাবার কাছ থেকে পেয়েছি। বাবারা বোকা হয়, এক টাকাও না খেয়ে সন্তানের জন্য সব দেয়। বাবাই আমার সাহস, আমার এনার্জি।

আমি জানি, হয়তো আমি কখনো সাকসেস হতে পারব না, তবে সেদিন যদি সাকসেস হই, আমার সফলতার ক্রেডিট আমার বাবার নামেই থাকবে। আমার বড়লোক আত্মীয়-স্বজন, কাছের মানুষ কেউ নিতে পারবে না। প্রথম পাবেন বাবা, দ্বিতীয় পাবেন মা — যারা প্রতিদিন আমার জন্য চোখের জল ফেলেন।

৭ মাস প্রবাস জীবন পার করেছি, মা’র সাথে কথা বলতেও মন চায় না, কান্না আসে। মা বলে, “তুই ছাড়া আমার আর কে আছে?” আমার বাবাও এই বয়সে কুয়েত চলে গেছেন, নিজের স্বাস্থ্য ঝুঁকি নিয়ে, আমার জন্য। আমি চাই তাকে সুন্দর একটা জীবন দিতে, কিন্তু এখনো পারিনি।

যদি আমার স্বপ্ন পূরণ না হয়, মাঝ পথে কিছু হয়, তবে বাবাকে বলবো, আমাকে মাফ করে দিবে। তবে ব্যর্থ খাতায় নাম লিখে দিবে না। আমি শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত চেষ্টা করবো।

প্রবাস জীবনের এত কষ্টের মাঝে একটাই শিখেছি — প্রিয়জনের কষ্টের চেয়ে পৃথিবীতে তীব্র কষ্ট আর কিছু নেই। হাজার হাজার প্রবাসী যেমন পুড়ছে এই যন্ত্রণা নিয়ে, তাদের জন্যও এই গল্প।

Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *